ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি হুমকির মুখে

জানুয়ারির মাঝামাঝিতে হোয়াইট হাউজে অভিষেক হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।

জানুয়ারির মাঝামাঝিতে হোয়াইট হাউজে অভিষেক হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ওই সময় থেকে দেশটি বিভিন্ন খাতে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিনিয়োগের এ জোয়ারে ভাটা এনে দিতে পারে নতুন শুল্কনীতি। এমনকি এরই মধ্যে পাওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোও পড়ে গেছে হুমকির মুখে। বিশেষ করে বিস্তৃত পরিসরে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক-পরবর্তী বাণিজ্যযুদ্ধ বিনিয়োগ স্থবিরতার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে দেশীয় ও বিদেশী কোম্পানির বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত দেশটির বেসরকারি খাতে প্রায় ৯১ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি আসে। অর্থাৎ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শুরুর কয়েক মাসে বেশি প্রতিশ্রুতি এলেও তার বাস্তবায়ন হুমকির মুখে পড়েছে।

সাম্প্রতিক বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির শীর্ষে রয়েছে সফটব্যাংক ও চিপ নির্মাতা টিএসএমসি। দুই কোম্পানিই ১০ হাজার কোটি ডলার করে বিনিয়োগ করবে বলে জানিয়েছিল। এছাড়া ফরাসি শিপিং গ্রুপ সিএমএ সিজিএম ২ হাজার কোটি, অ্যাপল ৫০ হাজার কোটি এবং গাড়ি নির্মাতা স্টেলান্টিস ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বড় হিস্যা রয়েছে এমন কোম্পানি থেকেই এ প্রতিশ্রুতির বড় অংশ এসেছে। আবার এ সরবরাহ চেইন ট্রাম্প ঘোষিত শুল্কের আওতায় পড়ছে এবং কোম্পানিগুলো চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্পর্কিত।

ট্রাম্পের পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ আকর্ষণ কমে যাবে বলে ধারণা ডার্টমাউথ কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ টেরেসা ফোর্টের। তিনি বলেন, ‘শুল্কের কারণে শুধু ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগই হুমকিতে পড়বে এমন নয়। বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ট্রাম্প যে পরিমাণ অনিশ্চয়তা তৈরি করেছেন তা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।’

গত মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, নতুন বাণিজ্যনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বাড়ছে। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর পরই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ অঞ্চলটিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বন্ধ রাখার আহ্বান জানান।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের প্রশ্ন ছিল, মার্কিন শুল্ক ঘোষণার মাঝে দেশটিতে বৃহৎ ইউরোপীয় কোম্পানির বিনিয়োগ কী বার্তা দেবে? শুল্কছাড়ের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলাদা দরকষাকষিতে না নামে।

যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় বিদেশী বিনিয়োগের উৎস জাপান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুসারে, ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা বলেছিলেন, মার্কিন শুল্ক ব্যবস্থা জাপানি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে।

কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘রক্ষণশীল বাণিজ্যনীতি’ যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়াতে পারে। কারণ অনেক দেশ ভাবছে, তারা এর মাধ্যমে রফতানি পণ্যে ছাড় আদায় করতে পারবে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ক্যাপজেমিনি রিসার্চ ইনস্টিটিউট পূর্বাভাস দিয়েছিল, আগামী তিন বছরে উৎপাদন কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনতে মার্কিন কোম্পানিগুলো ১ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার খরচ করবে। ২০২৪ সালের পূর্বাভাসে, অর্থের এ অংক ছিল ৭৫ হাজার কোটি ডলার।

তবে ক্যাটো ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্কট লিনসিকমের মতে, শুল্কের কারণে করপোরেট আয় হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনীতির গতি ধীর হতে পারে। এমন পরিস্থিতি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের আগ্রহে ধাক্কা দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘যারা ভেবেছিলেন বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়ে শুল্ক হ্রাস কমানো যাবে, তারা স্পষ্টতই ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। নতুন করে ঘোষিত শুল্ককে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা হিসেবে দেখা যায় না।’

জিপ ও র‍্যাম ট্রাক তৈরির জন্য পরিচিত স্টেলান্টিস এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ কারখানা থেকে ৯০০ কর্মী ছাঁটাই করবে এবং কানাডা ও মেক্সিকোয় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখবে।

অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির কতগুলো নতুন বা কতটা বাস্তবায়ন হবে বলা কঠিন। কারণ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কিছু বিনিয়োগ ঘোষণা আগেই পরিকল্পিত ছিল, আবার বাইডেনের সময় ঘোষিত প্রতিশ্রুতির কতটা কার্যকর হয়েছে তাও পরিষ্কার নয়। নাম উল্লেখ না করা এক বিশেষজ্ঞের মতে, জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে আসা বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি নতুন প্রশাসনের অর্জন নয়। কারণ এ ধরনের আর্থিক পরিকল্পনা অনেক দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার।

অ্যাপল ফেব্রুয়ারিতে ৫০ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঘোষণা দিলেও শুল্ক ঘোষণায় কোম্পানির এশিয়ার উৎপাদন ও সরবরাহ কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বাজারমূল্য কমেছে ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি। অ্যাপল যুক্তরাষ্ট্রে বড় অংকে বিনিয়োগ করলেও এর কতটা নতুন প্রশাসনের প্রভাবে হয়েছে, তা বলা কঠিন। অন্যদিকে আগামী তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি ও ইস্পাত শিল্পে ২ হাজার ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ এবং ১ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই। তবুও বিদেশী গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রয়েছে। অন্যদিকে জাপানের সফটব্যাংক প্রসঙ্গে অ্যাস্ট্রিস অ্যাডভাইজরির বিশ্লেষক কার্ক বদ্রি বলছেন, শুল্কের কারণে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি পতন দেখা দিলে প্রতিষ্ঠানটিকে হয়তো সম্পদ বিক্রি করে টিকে থাকতে হবে। ২০২০ সালের মহামারীর সময়ও এমনটা ঘটেছিল।

আরও